বিনোদন সাংস্কৃতিক, সুনজর প্রতিবেদন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জগৎজ্যোতি ছিলেন সুনামগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির কর্মী

রাজাকাররা জ্যোতি হত্যার ঘটনা ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য জ্যোতির অর্ধমৃত দেহ কে আজমিরীগঞ্জ গরুর হাটে একটি খুঁটির সঙ্গে ঝুলিয়ে শরীরে পেরেক মেরে জনসমক্ষে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। হাফপ্যান্ট ও গেঞ্জি পরা জ্যোতির নিথর দেহটি কোন সৎকার ছাড়াই ঝুলে থাকে। অমানুষিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে প্রাণ ত্যাগ করেন তিনি। তারপর জ্যোতির দেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয় কুশিয়ারা নদীর জলে। জগৎজ্যোতি দাসের মৃত্যুর তারিখটি ছিল ১৬ নভেম্বর ১৯৭১। দুর্ধর্ষ দাস পার্টির কমান্ডার এই তরুণ মাত্র ২২ বছর বয়সে যে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন সেটা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও বিরল।

আমরা বলতেই পারি জগৎজ্যোতি দাস বাংলার যীশু। যীশু খৃষ্টকে যেমন জনসম্মুখে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল তেমনি জগৎজ্যোতি দাসকেও জনসম্মুখে খুঁটির সাথে পেরেক মেরে নির্যাতন করা হয়। এই যুদ্ধের মাঝেও রাজাকারেরা ক্যামেরা দিয়ে সেই ছবি তুলে রাখে। কারণ মানুষটা জগৎজ্যোতি দাস।

ভাটি এলাকার কিংবদন্তী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামের জিতেন্দ্র চন্দ্র দাস ও হরিমতি দাসের কনিষ্ঠ পুত্র জগৎজ্যোতি। সবাই তাকে ছোট বেলায় জগৎ বলেই ডাকতো। ১৯৪৯ সনে ২৬ এপ্রিল তিনি জন্মগ্রহন করেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জগৎজ্যোতি ১৯৬৮ ইং সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ভারতের আসাম প্রদেশে তার কাকা ননী গোপাল দাসের বাসায় থেকে সেনা প্রশিক্ষণ শেষ করেন। পরে দেশ মাতৃকার টানে চলে আসেন মাতৃভূমিতে। বাম রাজনীতির সাথে যুক্ত জগৎজ্যোতি সুনামগঞ্জ সদর কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে জগৎজ্যোতি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ার আগ্রহে সদলবলে ভারতের শিলংয়ে ট্রেনিং নেন সততা ও নিষ্ঠার সাথে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে দাসপার্টি মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়ায় পাক হানাদারদের কাছে। জগৎজ্যোতির মুখোমুখি হওয়া মানে হানাদারদের একটি পরাজয়ের গল্প। উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনে মুক্তি সেনাদের কাছে প্রেরণার রসদ হয়ে উঠেন তিনি। মৃত্যুর সময়ও তিনি রেখে যান সেই প্রেরণার উৎস।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জগৎজ্যোতি ছিলেন সুনামগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির কর্মী। তিনি একাধিক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তার ওপর দায়িত্ব পড়ে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরের অধীনে বিস্তীর্ণ ভাটি অঞ্চল শত্রুমুক্ত রাখার। দিরাই, শাল্লা, ছাতক, আজমিরিগঞ্জ, বানিয়াচং, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার নৌপথ পাক হায়েনাদের দখলমুক্ত রাখার যুদ্ধে নামে জগৎজ্যোতির ‘দাসপার্টি’। ভাটির জনপদে শত্রুদের ভিত কাঁপিয়ে দেয় জগৎজ্যোতির এই দাসপার্টি। দাসপার্টির মুহুর্মুহু আক্রমণে দিশাহারা পাকিস্তান সরকার রেডিওতে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়, ‘এই রুট দিয়ে চলাচলকারীদের জানমালের দায়িত্ব সরকার নেবে না’। মাত্র ১৩ জন সহযোদ্ধা নিয়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে পাকবাহিনীর প্রায় ২৫০ সৈন্যের একটি দলকে পর্যুদস্তু করেন তারা। এমনি আরও অনেক বিজয়ের গল্পের স্রষ্টা জগৎজ্যোতি। মাত্র ১০/১২ জন সহযোদ্ধা নিয়ে শ্রীপুর শত্রুমুক্ত করেন জগৎজ্যোতি। তাঁর নেতৃত্বে দাসপার্টি ভেড়ামাড়ায় শত্রুদের কার্গো কনভয় ধ্বংস করে দেয়। ১৬ নভেম্বর ৪২ জন সদস্য নিয়ে নৌকাযোগে বাহুবল অভিযানে যাচ্ছিলেন জগৎজ্যোতি। পথে বদলপুর নামক স্থানে অজান্তেই রাজাকার ও হানাদারদের পাতা ফাঁদে পা দেন তিনি।

জগৎজ্যোতির মৃত্যু সংবাদ ওই সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, অল ইন্ডিয়া রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তাঁর অসীম সাহসিকতার প্রতি সম্মান জানিয়ে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার তাকেই প্রথম মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব ঘোষণা করেন। কিন্তু ১৯৭২ সালে তাঁকে ‘বীরবিক্রম’ খেতাব প্রদান করা হয়। কিন্তু ঘোষণা দিয়েও কেন জগৎজ্যোতিকে মরণোত্তর সর্বোচ্চ খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’র সম্মানে ভূষিত করা হলো না- বিষয়টি আজও প্রশ্নবোধক হয়ে রয়ে গেছে। মুজিবনগর সরকারের বরাত দিয়ে তখন আকাশবাণী রেডিও থেকে বলা হয়, জগৎজ্যোতি দাসকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করবে, এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জগৎজ্যোতি দাসের নামের আগে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উচ্চারণ করা হয়। বাংলাদেশ সেই কথা রাখে নাই।

গ্যালিলিওর প্রতি কৃত অপরাধের জন্য ভ্যাটিকান চার্চ ক্ষমা চেয়েছে গ্যালিলিওর কাছে। মহান এই বিজ্ঞানীর মৃত্যুর মাত্র সাড়ে চারশো বছর পরে ক্ষমা চেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এইতো সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দিয়ে ক্ষমা চাইল। বাংলাদেশ সরকারও হয়তো ঠিকই একদিন বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি দাসের ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব ফিরিয়ে দিবে।

Facebook Comments